পৃথিবীর দীর্ঘতম পাঁচ নদী

প্রাচীনকাল থেকেই সভ্যতার অন্যতম অনুসঙ্গ নদী। নদীকে আবর্তন করেই যেমন গড়ে উঠেছে হাজারো সভ্যতা আবার তেমনি নদীর কারণেই যে কত শত সভ্যতা বিলীন হয়ে গেছে তার হিসাবও অজানা। পৃথিবীর বুক চিরে বয়ে চলা কয়েক হাজার ছোট বড় নদীর মধ্যে আজ বলব দীর্ঘতম পাঁচটি নদীর কথা।

নীল নদ : পৃথিবীর দীর্ঘতম নদীর নাম নীল নদ। উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত এই নদীটির দৈর্ঘ ৬ হাজার ৬৯৩ কিলোমিটার। পৃথিবীর দীর্ঘতম এই নদী প্রবাহিত হয়েছে বেশ কয়েকটি দেশের মধ্য দিয়ে। প্রাচীনকাল থেকেই পৃথিবীর ইতিহাসে এই নদীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। এই নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতা। এখনো মিসরের কৃষি টিকে আছে এই নীল নদ কেন্দ্রিক। এমনকি মিসরের প্রায় ৯৯ভাগ মানুষ বাস করে নীল নদের অববাহিকায়। তবে এই নদীর উৎপত্তি কিংবা শেষ কিন্তু মিসরে নয়। আর অভাবনীয় বিষয় হচ্ছে, এই নদীর উৎপত্তি কিন্তু একটি নয় বরং দুটি দেশে! একটি অংশ ইথিওপিয়ার তানা হ্রদ থেকে উত্তর দিকে ব্লু নীল নামে প্রবেশ করেছে সুদানে আর অপর অংশ বুরুন্ডি, রুয়ান্ডা থেকে শুরু করে, তাঞ্জানিয়ার ভিক্টোরিয়া হ্রদ ও উগান্ডা হয়ে সুদানে প্রবেশ করেছে হোয়াইট নীল নামে। এই দুটি অংশ সুদানের রাজধানী খার্তৃমে একসাথে মিলিত হয়ে প্রবেশ করেছে মিশরে। তারপর মিশরের মরুভূমি চিরে প্রবাহিত হয়ে চলে গেছে ভূমধ্যসাগরে। আর চলার পথে ইথিওপিয়া, মিসর, সুদান, দক্ষিণ সুদান, কেনিয়া, উগান্ডা, বুরুন্ডি, রুয়ান্ডা, কঙ্গো এবং তাঞ্জানিয়ার সাথে জড়িয়ে আছে পৃথিবীর দীর্ঘতম এই নদী।

আমাজন : দৈর্ঘ্যের বিচারে পৃথিবীর দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী আমাজন। এই নদীটির উৎস পেরুর আন্দিজ পর্বতের নেভাদো মিসমি নামক চূড়া থেকে। আমাজনের দৈর্ঘ ৬ হাজার ৪৩৬ কিলোমিটার। চলার পথে এই নদীটি তিনটি দেশের বুক চিরে মিশে গেছে আটলান্টিকের বুকে। দৈর্ঘের দিক থেকে দ্বিতীয় হলেও পানি এই নদী যে পরিমাণ পানি ধারণ করে তা পৃথিবীর অন্য কোন নদীর সেই সক্ষমতা নেই। আমাজন নদী সেকেন্ডে প্রায় ২ লাখ ৯ হাজার ঘনমিটার পানি বহন করে সাগরে নিয়ে যায়। পৃথিবীর সব নদীগুলোর সমুদ্রে বহন করে নিয়ে যাওয়া পানির প্রায় বিশ ভাগই সাগরে পতিত হয় এই নদীর মাধ্যমে। ব্রাজিল, কলম্বিয়া ও পেরুর বুক চিরে বয়ে চলা এই নদীটিকে কেন্দ্র করে প্রাণ-বৈচিত্রে ভরপুর দক্ষিন আমেরিকার সুবিশাল অঞ্চল।

ছাং চিয়াং : ছাং চিয়াং নদী আয়তনে পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম তবে এশিয়ায় এটিই সবচেয়ে দীর্ঘতম নদী। এর আরেকটি নাম ইয়াংসি। ছাং চিয়াংয়ের উৎপত্তিস্থল ছিংহাই-তিব্বত মালভূমি অঞ্চলের টাংগুলা পর্বতশ্রেণী থেকে। আর সবশেষ পতিত গিয়ে মিশেছে পূর্ব চীন সাগরে। ছাং চিয়াংয়ের দৈর্ঘ ৬ হাজার ৩৭৮ কিলোমিটার। চীনের অর্থনীতি, ইতিহাস কিংবা সংস্কৃতি সবকিছুতেই এই নদীর রয়েছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। অভাবনীয় বিষয় হচ্ছে, চীনের প্রায় তিনভাগের একভাগ মানুষ বাস করে এই নদীর অববাহিকায়। চীনের পাঁচ ভাগের একভাগ অঞ্চলের পানির প্রধান উৎস ছাং চিয়াং। বিশ্বের সর্ববৃহৎ জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মিত হয়েছে এই নদীর উপর।

মিসিসিপি ও মিসৌরি : মিসিসিপি ও মিসৌরির অবস্থান আমেরিকায়। মিসিসিপি অবশ্য আমেরিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী। আমেরিকার সবচেয়ে দীর্ঘ নদী মিসৌরি মিসিসিপিতে এসে মিশে যৌথ আয়তনে মিসিসিপি ও মিসৌরি দখল করে নিয়েছে পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম নদীর অবস্থান। এদের মিলিত দৈর্ঘ ৫ হাজার ৯৭০ কিলোমিটার। মিসিসিপি নদীর প্রাথমিক উৎপত্তিস্থল ইটাস্কা লেক মনে করা হলেও মূল উৎস নিয়ে বিতর্ক আছে। মিসিসিপি নদী আমেরিকার সর্ববৃহৎ পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও উৎপাদন ব্যবস্থা মিসিসিপি নদী একটি বড় ভূমিকা রেখে চলেছে।

ইয়েনেসাই ও আংগারা : পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম নদী ইয়েনেসাই ও আংগারা। এদের দৈর্ঘ ৫ হাজার ৫৩৯ কিলোমিটার। ইয়েনেসাই নদীর উৎপত্তি মঙ্গোলিয়ায়। মঙ্গোলিয়া থেকে উৎপত্তি লাভ করে এটি প্রবেশ করেছে রাশিয়ায়। ৯৯২ কিলোমিটার লম্বা সিলেনজ নদী বিলীন হয়েছে বৈকাল হ্রদে। সেখান থেকে উৎপত্তি ঘটেছে আংগারা নদীর। এবং আংগারা নদী মিলিত হয়েছে ইয়েনেসাই নদীর সাথে। তারপর দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে মিশে গেছে আর্কটিক মহাসাগরে। উত্তর মহাসাগরে পতিত হওয়া নদীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বৃহত্তম ইয়েনেসাই। তবে ভারী শিল্পের জন্য নদীটি ব্যাপকভাবে দূষণের শিকার।