বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন: মহাকালের সাক্ষী লন্ডন

মানিক বলেন, কিন্তু তিনি যে লন্ডনে এইভাবে আসবেন সেটা আমাদের কল্পনায়ও ছিল না। যে মানুষটির ডাকে জীবন বাজি রেখে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে লাখ লাখ মানুষ। যাকে ধারণ করছি নিজেদের বুকে যার অপেক্ষায় স্বাধীন বাংলাদেশ, সাড়ে সাত কোটি বাঙালি, সেই মানুষটি আমাদের মাঝে আসলেন ৮ জানুয়ারি।

সকালবেলা বিখ্যাত ক্ল্যারেজ হোটেলের রাজকীয় স্যুইটে হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ আমরা। তখনো খুব বেশি মানুষের ভিড় হয়নি, বঙ্গবন্ধু সবার কথা জিজ্ঞাসা করছিলেন। দেশের ক্ষয়ক্ষতির কথা জিজ্ঞাসা করছিলেন। নারীদের মধ্যে সেখানে উপস্থিত ছিলেন ড. সুরাইয়া খানম যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন পরবর্তী সময়ে। ছিলেন শেফালি বেগম ও আওয়ামী লীগ নেতা বর্তমানে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান শরীফের আইরিশ স্ত্রী নোরা শরীফ।

শেফালী-সুরাইয়ারা বঙ্গবন্ধুকে দেখে হাউমাউ করে কাঁদছিলেন। শেফালী তো প্রায় অজ্ঞান হওয়ার মতো অবস্থা। বঙ্গবন্ধু বারবার জিজ্ঞাসা করছিলেন শহীদদের কথা, দেশের কথা, ধ্বংসের কথা, সেখানে উপস্থিত কেউ আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলেন না। বঙ্গবন্ধু উদগ্রীব ছিলেন কখন বাংলাদেশে ফিরবেন। সেখান থেকেই দেশে টেলিফোনে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলেছিলেন।

রাস্তায় তখন শত শত মানুষ। এক নজর তাদের প্রিয় বঙ্গবন্ধুকে দেখতে চান। হোটেল কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হয়েছে সেই ভিড় সামলাতে। সবাইকে হোটেলে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। বঙ্গবন্ধু জানালায় এসে বারবার হাত নাড়ছেন, বাইরে শ্লোগান হচ্ছে জয়বাংলা জয়বঙ্গবন্ধু!

হোটেলে অবস্থানকালেই আমেরিকার সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। সেই সাত সকালেই সেখানে ছুটে এসেছিলেন সেই সময়ের ব্রিটেনের বিরোধী দলের নেতা হ্যারল্ড উইলিয়াম যিনি পরবর্তীতে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। সেখানে এসে বঙ্গবন্ধুকে প্রথম মি. প্রেসিডেন্ট বলে সম্বোধন করেছিলেন তিনি।

সেদিন ইতিহাসের সেই মাহেন্দ্রক্ষণে অনেকের মাঝেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন শেখ আব্দুল মান্নান, নজরুল ইসলাম, খন্দকার মোশারফ হোসেন (বর্তমানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য), জাকারিয়া খান, (জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী), লুলু বিলকিস বানু, জেবুন্নেসা বক্স, গাউস খান আতাউর রহমান খান, আব্দুল হামিদ, রমজান আলীসহ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ।

বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলছিলেন, ‘আমি যখন হোটেল থেকে বের হয়ে আসছিলাম শত শত মানুষের চোখে সেদিন দেখেছিলাম আনন্দে অশ্রু ঝরছে, বৃষ্টি উপেক্ষা করেই শ্লোগান দিচ্ছে জয়বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু। এই মুহূর্তগুলো খুব কম মানুষের জীবনেই আসে। এই সময়গুলোকে ধারণ করা যায় কিন্তু ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।’