মার্চ-এপ্রিলে বাংলাদেশের এয়ারলাইনসগুলোর লোকসান ১৩৬১ কোটি টাকা

করোনাভাইরাস মহামারির দুই মাস পরও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় রুটে সব ফ্লাইট স্থগিত থাকায় মার্চ ও এপ্রিল মাসে সব দেশীয় ও রাষ্ট্র পরিচালিত এয়ারলাইনস-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো এক হাজার ৩৬১ কোটি টাকা লোকসান করেছে। বার্তা সংস্থা ইউএনবির এক প্রতিবেদনে এ খবর জানানো হয়েছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মহিবুল হক জানান, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে মে ও জুন মাসে সম্ভাব্য লোকসান হবে আরো এক হাজার কোটি টাকার বেশি।

মহিবুল হক আরো জানান, করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে বিমান চলাচল স্থগিত থাকায় মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের লোকসান হয়েছে ৯৩৯ কোটি টাকা, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ২৫০ কোটি, নভোএয়ারের ৩২ কোটি এবং রিজেন্ট এয়ারের ১৪০ কোটি টাকা।

মহিবুল বলেন, ‘পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে রাষ্ট্র পরিচালিত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ক্ষতি হবে ৭৮০ কোটি টাকা। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস, নভোএয়ার ও রিজেন্ট এয়ারওয়েজের লোকসান হবে যথাক্রমে ১২৫ কোটি, ৩৬ কোটি ও ৬০ কোটি টাকা।’

কোনো কর্মী ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা রয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে মহিবুল বলেন, ‘বিদেশে বিমান সংস্থাগুলোর কয়েক হাজার কর্মীকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে আমরা সে পথে যেতে চাই না। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্মীদের বেতন ১০ থেকে ৫০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে।’

আরো স্থগিতাদেশের বিষয়ে জানতে চাইলে জ্যেষ্ঠ সচিব বলেন, ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে আমাদের কোনো লাভের দরকার নেই। আমরা কেবল কর্মীদের বেতন প্রদানের পর কার্যক্রম চালু রাখতে চাই। লাভ নিয়ে আমরা পরে চিন্তা করব, যখন পরিস্থিতি আরো ভালো হবে। কারণ, আমরা লকডাউনের আগে ৪৬০ কোটি টাকা লাভ করেছি।’

‘এ মুহূর্তে এয়ারলাইনসগুলো চার্টার্ড ও পণ্যবাহী বিমান থেকে অর্থ উপার্জন করবে এবং প্রয়োজনে যাত্রীবাহী বিমানগুলো পণ্য বহনের জন্য ব্যবহৃত হবে,’ যোগ করেন মহিবুল।

বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলো তাদের কর্মীদের বেতন প্রদান করছে কি না জানতে চাইলে মহিবুল বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। তবে তাদের সমস্যা হওয়ার কথা।’

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ মোকব্বির হোসেন বলেন, ‘দেড় হাজার কোটি টাকা ঋণ চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি আবেদন করা হলেও আমরা এক হাজার কোটি টাকা পেয়েছি এবং এটি পরবর্তী এক বছরের মধ্যে ৪ শতাংশ সুদে পরিশোধ করা হবে।’

মোকব্বির হোসেন জানান, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে ৬০০ কর্মী রয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাঁদের বেতন দিতে সমস্যায় পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিমানের পরিচালনা পর্ষদ বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিমানকর্মীদের বেতন ১০ থেকে ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সিইও বলেন, ‘বিমানের কোনো কর্মীকে প্রত্যাহার করার মতো সিদ্ধান্ত নেই। চার্টার্ড ফ্লাইট পরিচালনা করে আমরা বিমানবন্দর গ্রাউন্ড পরিষেবা থেকে অর্থ পাচ্ছি।’

এ ছাড়া বিজিএমইএ ও এফবিসিসিআইর অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ২৩ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত কার্গো সেবার কোনো অর্থ গ্রহণ করবে না বিমান।

নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান বলেন, ‘সরকারের কাছে আবেদন করার পরও আমরা পার্কিং, সিটিং ও ভাড়ার খরচ নেওয়ার এবং ব্যাংক ঋণের কিস্তি প্রদানের বিষয়ে কোনো সমাধান পাইনি।’

মফিজুর রহমান আরো বলেন, ‘করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে বিমান সংস্থাগুলো ব্যাপক হুমকির মুখে পড়েছে। কারণ, বেসামরিক বিমান চলাচল, বেতন ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় তাকে বহন করতে হয়।’

কোনো শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে মফিজুর বলেন, ‘আমি এ ধরনের কোনো সংবাদ পাইনি। নভোএয়ারে ৮০০ কর্মী রয়েছেন এবং আমরা এখন পর্যন্ত কর্মীদের বেতনও দিয়েছি।’

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম বলেন, ‘ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসে এক হাজার ৪০০ কর্মী রয়েছেন এবং সব কর্মীই গত এক মাসের বেতন পেয়েছেন। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ ইতিবাচক থাকায় কাউকে ছাঁটাই করা হয়নি। আমরা এখন প্রতিদিন ১০০ কোটি টাকা লোকসান গুনছি।’

‘চলমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এ খাতে কী হবে, তা বলা মুশকিল। এমনকি করোনাভাইরাস পরিস্থিতি যদি স্বাভাবিক হয়ে যায় এবং বিমান চলাচল শুরু হয়, তবুও সমস্যা থাকবে। কারণ, পর্যটকরা আগামী কয়েক মাস কোনো দেশে ভ্রমণ করা থেকে বিরত থাকবে এবং সাধারণ মানুষও কম ভ্রমণ করবে,’ যোগ করেন কামরুল।

রিজেন্ট এয়ারওয়েজের সূত্রমতে, সংস্থাটিতে ৭০০ কর্মী রয়েছেন এবং লকডাউন ঘোষণার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তিন মাসের জন্য অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় রুটে বিমান পরিচালনা থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিয়েছে।

চলমান করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের মধ্যে প্রাণঘাতী এ ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে চীন ছাড়া সব দেশের সঙ্গে যাত্রীবাহী বিমান চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ ৩০ মে পর্যন্ত বাড়িয়েছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।