জেনেভা ক্যাম্পে প্রকাশ্যে গলা কেটে যুবককে হত্যা

জেনেভা ক্যাম্পে প্রকাশ্যে গলা কেটে যুবককে হত্যা

মুহুর্মুহু ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দে কয়েক দিন ধরেই আতঙ্কিত রাজধানীর মোহাম্মদপুরে জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দারা। মাদক কারবারিদের আধিপত্য কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার থেকে থেমে চলছে ভয়াবহ এই সংঘর্ষ।

সংঘর্ষের পঞ্চম দিন সোমবার শাহ আলম (২২) নামে এক যুবককে প্রকাশ্যে গলা কেটে হত্যা করেছে প্রতিপক্ষ। এ সময় আরও তিনজন গুরুতর আহত হয়েছেন। তারা হলেন বশির বাবুর্চি (৪০), মদিনা (২০) ও ফায়জান (২৫)। সোমবার দুপুর ৩টার দিকে ক্যাম্পের ভেতরে প্রকাশ্যে এ ঘটনা ঘটে।

জানা গেছে, ক্যাম্পের ৭ নম্বর সেক্টরের হুমায়ুন রোড এলাকায় হেরোইন বিক্রির স্পট দখল-পালটাদখলের প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট উত্তেজনা কেন্দ্র করেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সন্ত্রাসী বুনিয়া সোহেল আগে থেকেই হুমায়ুন রোড এলাকায় হেরোইন বিক্রি করে। এখানে নতুন করে পিচ্চি রাজা ও মনু মিয়ার নেতৃত্বে ইমতিয়াজ হেরোইন ব্যবসা শুরু করে। এই হেরোইনের স্পট দখলে নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে বুনিয়া সোহেল গ্রুপ। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেফতার করেছে। তারা হলেন ফয়সাল (২৫) ও সেলিম (২৪)। তাদের কাছ থেকে দুটি ধারালো চাপাতি জব্দ করেছে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ।

ময়নাতদন্তের জন্য নিহত শাহ আলমের লাশ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। শাহ আলমের বিষয়ে তাৎক্ষণিক বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। একই ঘটনায় আহত অন্যদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এসিডি) জুয়েল রানা জানান, সোমবার দুপুরের পর জেনেভা ক্যাম্পে অভিযান চালানো হয়েছে। এ সময় ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুজনকে দেশীয় অস্ত্রসহ আটক করা হয়েছে। ক্যাম্পের শীর্ষ মাদক কারবারিদের ধরতে অভিযান চলছে।

এদিকে হত্যার মুহূর্তের একটি ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে নেটে। সেখানে দেখা গেছে, শাহ আলমের পুরো শরীর রক্তে ভেজা। গলায় জখমের চিহ্ন। ভিডিওতে নড়াচড়া করতে দেখা গেছে তাকে। ওই সময় গলায় গামছা প্যাঁচিয়ে রক্তক্ষরণ বন্ধ করে শাহ আলমকে উদ্ধার করতে দেখা গেছে দুই ব্যক্তিকে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জেনেভা ক্যাম্পের শীর্ষ মাদক কারবারিরা আদালত থেকে সবাই জামিনে ছাড়া পাওয়ায় নতুন করে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। শীর্ষ এসব মাদক ব্যবসায়ীর সব মামলায় জামিন বাতিল চেয়েছেন বাসিন্দারা। স্থানীয়দের অভিযোগ, শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী বুনিয়া সোহেল ও ‘শান্তি বাহিনী’ মিলে একের পর এক নিরীহ বাসিন্দাদের ওপর হামলা করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।

সূত্র বলছে, গত পাঁচ দিন ধরে মাদকের কারবার নিয়ে জেনেভা ক্যাম্পের বুনিয়া সোহেল গ্রুপের সঙ্গে চুয়া সেলিম, পিচ্চি রাজা এবং পার মনু গ্রুপের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ চলে আসছিল। বিশেষ করে রোববার থেকে এ সংঘর্ষ ভয়াবহ রূপ নেয়। এদিন দিন-রাত ক্যাম্পের ভেতরে থেমে থেমে সংঘর্ষ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার দুপুরে ক্যাম্পের ৭ নম্বর সেক্টরের শেষ মাথায় হুমায়ুন রোড ময়লার গলিতে দুই গ্রুপের সংঘর্ষকালে একজনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

ক্যাম্প বাসিন্দাদের সূত্রে জানা যায়, জেনেভা ক্যাম্পের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী বুনিয়া সোহেল ও বেজি নাদিম মিলে জেনেভা ক্যাম্পের সন্ত্রাসী বাহিনী ‘শান্তি বাহিনী’কে ভাড়া করে। শান্তি বাহিনীর প্রধান শাহনেওয়াজ সান্নুর নেতৃত্বে পিচ্চি রাজার মাদকের স্পট দখলে নিতে প্রথমে ককটেল বিস্ফোরণ করে হামলা চালায়। গত পাঁচ দিনে অন্তত আটটি ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছে স্থানীয়রা। বুনিয়া সোহেলকে পিস্তল উঁচিয়ে কয়েক রাউন্ড গুলি ছুঁড়তেও দেখেছে বাসিন্দারা। সূত্র বলেছে, পুরো জেনেভা ক্যাম্পের মাদকের আধিপত্য দখল করতে বুনিয়া সোহেলের সঙ্গে বেজি নাদিম, পোপলা মুন্না, চুয়া সেলিম, খুল্লা সাহিদ ও দোগলা আজম যোগ দিয়েছে। মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত জেনেভা ক্যাম্পে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।‎

সংঘর্ষের সূত্রপাত: বৃহস্পতিবার রাতে জেনেভা ক্যাম্পের পাকা ক্যাম্প এলাকায় শোহরাবের পান দোকানের সামনে বিয়ের গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানে বুনিয়া সোহেলের নেতৃত্বে কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী দেশীয় ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এসে কয়েকটি ককটেল নিক্ষেপ করে। এ সময় বাবুর্চি নাসির নামে একজন গুরুতর আহত হয়। এ ঘটনার দুদিন পর রোববার দুপুর দেড়টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জেনেভা ক্যাম্পের ৮ নম্বর সেক্টর এলাকায় তিন দফায় তিনটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় বুনিয়া সোহেল ও তার সহযোগীরা। এতে এলাকার অনেক দোকানের ক্ষয়ক্ষতি ও বেশ কয়েকজন আহত হন। এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর আহত হন মানসিক ভারসাম্যহীন মদিনা বেগম নামে এক নারী।

জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা জিয়াউদ্দিন বলেন, গত শুক্রবারও মাদক ব্যবসা কেন্দ্র করে বুনিয়া সোহেল পিচ্চি রাজাকে লক্ষ্য করে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। বুনিয়া সোহেল মোটরসাইকেলে এসে প্রকাশ্যে ককটেল ফাটিয়ে চলে যায়। সোমবার দুপুরেও শীর্ষ মাদক কারবারি বুনিয়া সোহেল জন্ডিস গলিতে এসে ককটেল নিক্ষেপ করে। এতে এক নারী আহত হয়েছেন বলে শুনেছি। পুলিশ বা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জেনেভা ক্যাম্পে ঢোকার আগেই তারা খবর পেয়ে যায়। তারা বিভিন্ন জায়গায় সোর্স রাখে। তারাই খবর দেয়।

‎জেনেভা ক্যাম্পের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, শীর্ষ মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসী বুনিয়া সোহেল জেনেভা ক্যাম্পের ৭ নম্বর সেক্টরের আব্দুস সালামের ছেলে। বুনিয়া সোহেল ছাড়াও পোপলা মুন্না, বেজি নাদিম, চুয়া সেলিম, খুল্লা সাহিদ ও দোগলা আজমের নামে একাধিক মাদক ও হত্যা মামলা রয়েছে।

আরেক মাদক ব্যবসায়ী পিচ্চি রাজার নামে মাদক ও হত্যাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। গত বছরের ৩১ অক্টোবর সিলেটের কোতোয়ালি এলাকা থেকে বুনিয়া সোহেলকে র্যাব গ্রেফতার করে। এর কয়েক মাস পরই জেল থেকে ছাড়া পেয়ে যায় শীর্ষ এই মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসী। জেল থেকে বের হয়ে আবারও তার লোকজন দিয়ে মাদক ব্যবসা শুরু করে। চলতি বছরের ৪ জুন রাতে সেনাবাহিনী ও র্যাব-২ যৌথভাবে একটি ফার্মেসি থেকে বুনিয়া সোহেলের মাদক বিক্রির কয়েক কোটি টাকা জব্দ করে।

জেনেভা ক্যাম্পে সেনাবাহিনীর অভিযান: এদিকে হত্যাকাণ্ডের পর রাতেই জেনেভা ক্যাম্পে মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসীদের ধরতে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে অভিযান শুরু করে যৌথ বাহিনী। সোমবার রাত ৮টা ২০ মিনিট থেকে এ অভিযান শুরু হয় বলে জানা গেছে। রাত সাড়ে ৯টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অভিযান চলছিল। অভিযানে থাকা এক সেনা কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, মাদক কারবারিরা তাদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে। এই অভিযানে মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনা হবে। এছাড়া অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারেও অভিযান চলমান রয়েছে।

চট্টগ্রাম উপকূলে নৌকাডুবি : নিখোঁজ আরো এক জেলের লাশ উদ্ধার পরবর্তী

চট্টগ্রাম উপকূলে নৌকাডুবি : নিখোঁজ আরো এক জেলের লাশ উদ্ধার

কমেন্ট