
স্বদেশপ্রেম
ভূমিকা : সব প্রাণীই তার নিজ দেশ, নিজ মাতৃভূমি, নিজ বাসস্থানকে ভালোবাসে। পাখি ভালোবাসে তার নীড়কে, অরণ্যের ভয়াল জন্তুও ভালোবাসে তার গহিন বনকে। আর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ এ নিয়মের ব্যতিক্রম নয়। মানুষও ভালোবাসে তার দেশকে, পরিচিত পরিবেশকে। স্বদেশের প্রতি এই ভালোবাসা, গভীর অনুভূতি ও মমত্ববোধকেই দেশপ্রেম বলে। এ দেশপ্রেম মানবজীবনের অমূল্য সম্পদ। মানুষের মনে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এ দেশপ্রেমের জন্ম। এর মাধ্যমেই সে হয়ে ওঠে বিশ্ব নাগরিক।
স্বদেশপ্রেম কী : এক কথায় স্বদেশপ্রেম হচ্ছে নিজ দেশের প্রতি, জাতির প্রতি, ভাষার প্রতি সুতীব্র আকর্ষণ অনুভব করা। দেশের প্রতি গভীর অনুরাগ, নিবিড় ভালোবাসা ও যথার্থ আনুগত্যকেই দেশপ্রেম বলা হয়। যে ভৌগোলিক ও সামাজিক পরিবেশের মধ্যে মানুষ জন্মগ্রহণ করে ও বড় হয়ে ওঠে, সে পরিবেশের প্রতি, সেখানকার মানুষের প্রতি, তার একটি স্বাভাবিক আকর্ষণ অনুভূত হয়। কবি গেয়েছেন—
‘এই দেশেতে জন্ম আমার
এই দেশেই যেন মরি। ’
বৈশিষ্ট্য : দেশপ্রেম মানুষের চরিত্রের একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। বিশেষ ভৌগোলিক ও সামাজিক পরিবেশে জন্মগ্রহণ এবং সেখানে বড় হয়ে ওঠার ফলে একটা স্বাভাবিক আকর্ষণ গড়ে ওঠে। এই আকর্ষণ থেকে স্বদেশপ্রীতির যে বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায় তার জন্য মানুষ সব কিছু এমনকি নিজের জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিতে পারে।
নিজের দেশের মান গৌরব রক্ষার জন্য মানুষ অনেক ত্যাগ স্বীকার করে দেশপ্রেমের পরিচয় দেয়। মাকে মানুষ যেমন ভালোবাসে, তেমনি নিজের দেশকেও ভালোবাসে। দেশপ্রেমিক দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। এই জন্য ইসলাম ধর্মে দেশপ্রেমকে ঈমানের অঙ্গ বলা হয়েছে। দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য যুদ্ধ করে প্রাণ দেওয়া, জেহাদ করে শহীদ হওয়ার সমতুল্য।
ইতিহাসের পাতায় : প্রাচীনকালে পুরাণ মহাকাব্যে ও ইতিকাহিনীতে আমরা দেখতে পাই দেশকে ভালোবেসে কত মানুষ অকাতরে প্রাণ দিয়েছে। ইসলামী জীবনব্যবস্থায় ‘দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ’ হিসেবে বলা হয়েছে। মাতৃভূমি ও ইসলাম রক্ষার জন্য মুসলমানরা প্রাণ দিয়েছে অকাতরে। স্বদেশের জন্য আমাদের দেশের মানুষের আত্মত্যাগ অসীম। তিতুমীর, ক্ষুদিরাম, সূর্য সেন, সিরাজউদ্দৌলাসহ অসংখ্য দেশপ্রেমিক দেশের জন্য হাসতে হাসতে জীবন উৎসর্গ করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ত্রিশ লাখ মানুষ তাদের মূল্যবান জীবন দিয়ে স্বদেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল নজির রেখে গেছেন। তাদের এই আত্মত্যাগের কাহিনী পৃথিবীর ইতিহাসে জ্বলজ্বল করে।
দেশপ্রেমের স্বরূপ : জন্মভূমির স্মৃতি জীবনের সঙ্গে এক সূত্রে গাঁথা। কোনো ক্ষুদ্র ভূ-খণ্ডে, কোনো অখ্যাত পল্লীতে মানুষ জন্ম নেয়। তার বাল্য সে জন্মভূমিতেই কাটে। তাই পরবর্তী জীবনে শহরে বা অন্য কোনো জায়গায় গমন করেও কেউ নিজ দেশের কথা ভুলতে পারে না। কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত পাশ্চাত্য স্বপ্নবিলাসী ছিলেন। তিনি সেখানে গিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন, দেশের মাটি, দেশের মানুষ, দেশের প্রকৃতি কত প্রিয়।
স্বদেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ : প্রকৃতপক্ষে স্বদেশপ্রেমের উদ্ভব আত্মসম্মানবোধ থেকে। যে জাতির আত্মসম্মানবোধ যত প্রখর, সে জাতির স্বদেশপ্রেম তত প্রবল। স্বদেশপ্রেম এক প্রকার পরিশুদ্ধ ভাবাবেগ। নিঃস্বার্থ হিংসাহীন দেশপ্রেমই প্রকৃত স্বদেশপ্রেম। ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র স্বার্থের গণ্ডি উপেক্ষা করে বৃহত্তম স্বার্থের দিকে মন যখন পরিচালিত হয়, যখন আত্মকল্যাণ অপেক্ষা বৃহত্তম কল্যাণবোধ সক্রিয় হয়ে ওঠে, তখন জ্বলে ওঠে স্বদেশের প্রতি ভালোবাসার নিষ্কলুষ প্রদীপ শিখা।
দেশপ্রেমের মূল্য : দেশপ্রেমের মূল্য তুলনাহীন। ভালোবাসার ওপর জাতির উন্নতি, অগ্রগতি নির্ভর করে। দেশের জন্য মরা-বাঁচার শপথ নিয়ে জাতীয় গৌরব ও মর্যাদা রক্ষা করা একজন খাঁটি দেশপ্রেমিকের কর্তব্য। স্বার্থ ত্যাগ করে দেশের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয় দেশপ্রেমিক নাগরিক।
দেশপ্রেমের উপায় : দেশপ্রেম অনেক রকম। স্বাধীনতা রক্ষা, সাহিত্য, শিল্প ও অন্যান্য জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রে কাজ করে দেশপ্রেমের পরিচয় দেয়া যায়। বহু দেশপ্রেমিক যুগে যুগে জন্ম নিয়েছেন এবং তাদের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও মহৎ প্রাণের পরিচয় দিয়েছেন, যা আমাদের আজও অনুপ্রাণিত করে। তাদের আদর্শ ছিল দেশের তথা জাতি-বর্ণ-নর্বিশেষে সবার মঙ্গল সাধন করা। তাদের শৌর্যবীর্য ও চারিত্রিক দৃঢ়তা আবহমানকাল জাতীয় প্রেরণা জোগায়।
বাংলা কাব্যে দেশপ্রেম : সতেরো শতকের কবি আব্দুল হাকিম তাঁর নূরনামা কাব্যে বঙ্গবাণী কবিতায় দেশের প্রতি গভীর উপলব্ধি ও বিশ্বাসের কথা নির্দ্বিধায় ব্যক্ত করেছেন। কবি কায়কোবাদ পদ্মা, মেঘনা, যমুনা বিধৌত বাংলাদেশের মানুষকে একান্ত আপন ভেবে গেয়েছেন—
‘হৃদয় আমার বাংলার লাগি
যে দেশেই থাকি সদা থাকি জাগি,
স্বর্গ হতেও শ্রেষ্ঠ সে আমার
বাংলা আমার অমিয় ধারা। ’
কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় স্বপ্নময়, স্মৃতিময় এ দেশের রূপে বিমোহিত হয়ে গেয়েছেন—
‘ধনধান্যে পুষ্পভরা আমাদের এ বসুন্ধরা
তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা। ’
কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলাদেশকে সমগ্র মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবেসে রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থে গেয়েছেন—
‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর। ’
কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত সারা পৃথিবী বিচরণ করে মাতৃভূমিকে স্মরণ করে লিখেছেন—
‘বহু দেশ দেখিয়াছি, বহু নদ দলে
কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে?’
রবীন্দ্রনাথ গেয়েছেন—
‘ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা
তোমাতে বিশ্ব মায়ের আঁচল পাতা। ’
দেশপ্রেমের অভাব : দেশপ্রেমের অভাব মানুষকে অমানুষ করে তোলে। প্রচুর ধনসম্পদ, অসীম সামাজিক মর্যাদা, যথেষ্ট বিদ্যার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও কোনো ব্যক্তির অন্তরে যদি স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা না থাকে, তাহলে তার ধন-সম্পদ, বিদ্যা-বুদ্ধির কোনো মূল্যই থাকে না। দেশকে যে ভালোবাসে না, তার দ্বারা কোনো দিন দেশের কল্যাণ সাধিত হয় না। কবি তাই দেশপ্রেমহীন ব্যক্তির প্রতি ধিক্কার দিয়ে বলেন—
‘যে সাধেনি কভু জন্মভূমি হিত,
স্বজাতির সেবা যেবা করেনি কিঞ্চিৎ
জানাও সে নরাধমে জানাও সত্ত্বর
অতীব ঘৃণিত সেই পাষণ্ড বর্বর। ’
অন্ধ স্বদেশপ্রেমের পরিণতি: স্বদেশপ্রেম দেশ ও জাতির গৌরবের বস্তু। কিন্তু অন্ধ স্বদেশপ্রেম ধারণ করে ভয়ংকর রূপ। জাতিতে জাতিতে সংঘাত ও সংঘর্ষ অনিবার্য করে তোলে অন্ধ স্বদেশপ্রেম। আমরা স্বদেশের জয়গান গাইতে গিয়ে যদি অপরের স্বদেশপ্রেমকে আহত করি, তবে সেই স্বদেশপ্রেম বিভিন্ন দেশ ও জাতির মধ্যে ডেকে আনে ভয়াবহ রক্তাক্ত দ্বন্দ্ব-সংঘাত। হিটলারের ইউরোপ দখল কিংবা মুসোলিনীর ইতালী উগ্র জাতীয়তাবাদের নগ্নরূপ। চলমান বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্র কর্তৃক দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আগ্রাসী মনোভাব অন্ধ স্বদেশপ্রেমেরই বহিঃপ্রকাশ।
দেশপ্রেম ও রাজনীতি: রাজনীতিবিদদের প্রথম শর্তই দেশপ্রেম। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ রাজনীতিবিদ দেশের সদাজাগ্রত প্রহরী। পরাধীন বাংলাদেশের দিকে দিকে যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল গড়ে উঠেছিল, তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল পরাধীনতার বন্ধন থেকে দেশজননীর শৃঙ্খল মোচন। তাদের অবদানেই আজ দেশ স্বাধীন। রাজনীতির রক্তামঞ্চে এখনো কত নতুন দলের আবির্ভাব ও নিষ্ক্রমণ। কিন্তু অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই মহত্তর, বৃহত্তর কল্যাণবোধ থেকে ভ্রষ্ট। ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্ধ চিন্তাই অনেক ক্ষেত্রে প্রবল। দেশের স্বার্থে, জাতির স্বার্থে মানুষের প্রয়োজনে সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়ার সাধনা, দেশপ্রেমের অঙ্গীকার ও স্বার্থকতা তা এখন প্রায়ই অনুপস্থিত।
উপসংহার : বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় স্বদেশভূমি। এ দেশকে ভালোবেসে আমাদের সবার দেশপ্রেমের পরিচয় দেওয়া দরকার। দেশের কল্যাণের জন্য যদি আমরা ছাত্রসমাজ সুন্দর জীবন গড়ে তুলতে পারি এবং দেশের কাজে লাগাতে পারি, তবেই দেশপ্রেমের সার্থক পরিচয় দেওয়া যাবে। এই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়েই আমরা উচ্চারণ করি—
‘আমার সোনার বাংলা
আমি তোমায় ভালবাসি
চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস
আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি। ’
ব্যক্তিস্বার্থের ওপর স্থান দিতে হবে স্বদেশপ্রেমকে। জীবনের মূলে জাগিয়ে রাখতে হবে দেশপ্রেমের চেতনা। তাহলেই স্বাধীন জাতির মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকা যাবে।
কমেন্ট