
উদ্দীপকটি পড়ে নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
হাবিব সাহেব একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। তিনি ব্যবসার কাজে যতটুকু সময় ব্যয় করেন, তার চেয়ে বেশি সময় দেন দেশের নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধির কাজে। তিনি মনে করেন একসময় তাঁর দেশের শাসকরা তাঁদের ওপর যে অত্যাচার করেছিল, তা শুধু জনগণের অসচেতনতার কারণেই। অথচ একসময় যখন আমাদের দেশের কতিপয় লোক একটি দল গঠন করে এবং বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করে, তখন শাসকদের কর্তৃত্বে কড়া নড়ে। কর্মসূচির মধ্যে ছিল প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, জনগণের সার্বভৌমত্ব, পাট, চা শিল্প জাতীয়করণ ইত্যাদি।
ক. কত সাল থেকে ২১ শে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস হিসেবে দেশব্যাপী পালিত হয়ে আসছে?
খ. ‘ভাষা আন্দোলন যৌক্তিক একটি আন্দোলন’—বুঝিয়ে বলো।
গ. হাবিব সাহেব যে দল গঠনের তথ্য দিয়েছেন, আওয়ামী মুসলিম লীগের সঙ্গে এর সম্পর্ক নির্ণয় করো/ব্যাখ্যা করো।
ঘ. ‘হাবিব সাহেব দেশের জনগণকে রাজনৈতিক সচেতন করতে চেয়েছিলেন’—বিশ্লেষণ করো।
উত্তর : ক. ১৯৫৩ সাল থেকে ২১ শে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস হিসেবে দেশব্যাপী পালিত হয়ে আসছে।
খ. ১৯৪৮ সালে সূচিত হয় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালে তা প্রতিবাদ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে পরিণতি লাভ করে। ফলে পাকিস্তান সরকার বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে এটি অন্তর্ভুক্ত হয়। নিজের ইতিহাস-ঐতিহ্য, ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে পূর্ব বাংলার বাঙালি এবং অন্যান্য জনগোষ্ঠী মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস ও আত্মপ্রত্যয় খুঁজে পায়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল দেশের অধিকারবঞ্চিত মানুষের গণসচেতনতার প্রথম সংগঠিত বহিঃপ্রকাশ। এ ভাষা আন্দোলনের সচেতনতাই পরবর্তীকালে প্রতিটি গণ-আন্দোলনের প্রেরণা জোগায়। এটি জনগণের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির পথকে সুগম করে স্বাধীনতা অর্জনে সহায়তা করে। আর এখান থেকে বোঝা যায়, ভাষা আন্দোলন একটি যৌক্তিক আন্দোলন।
গ. উদ্দীপকে হাবিব সাহেব একজন ব্যবসায়ী। তিনি মনে করেন একসময় তাঁর দেশের শাসকরা তাঁদের ওপর যে অত্যাচার করেছিল, তা শুধু জনগণের অসচেতনতার কারণে। এরপর কতিপয় লোক একটি দল গঠন করে। শাসকদের বিরুদ্ধে নানা রকম কর্মসূচি ঘোষণা করে। পাঠ্যপুস্তকেও আমরা এমন একটি দল সম্পর্কে ধারণা পাই। হাবিব সাহেবের দলটির সঙ্গে পাঠ্য বইয়ের আওয়ামী মুসলিম লীগের সাদৃশ্য দেখতে পাই। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব বাংলার জনগণ পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাজনৈতিক চরিত্রগুলো বুঝতে পারে। পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষ সর্বক্ষেত্রে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকায় রোজগার্ডেনে এক সম্মেলনের মাধ্যমে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ গঠন করা হয়। সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন শেখ মুজিবুর রহমান। শুরুতেই দলটি বাঙালিদের স্বার্থে একটি বিস্তৃত কর্মসূচি গ্রহণ করে। এর মধ্যে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, জনগণের সার্বভৌমত্ব, বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দান, পাট ও চা শিল্পের জাতীয়করণ, বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি ব্যবস্থার উচ্ছেদ, সমবায়ভিত্তিক জমি চাষাবাদ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব দাবি উত্থাপনের কারণে দলটি দ্রুত পূর্ব বাংলার জনগণের কাছে প্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে। হাবিব সাহেব যে দল গঠন করেছেন তাতে আমরা দেখতে পাই, তাদেরও কর্মসূচি ছিল প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, জনগণের সার্বভৌমত্ব, পাট ও চা শিল্পের জাতীয়করণ ইত্যাদি। হাবিব সাহেব যে দল গঠনের তথ্য দিয়েছেন তার সঙ্গে আওয়ামী মুসলিম লীগের উল্লিখিত সম্পর্কগুলো লক্ষ করা যায়।
ঘ. হাবিব সাহেব দেশের জনগণকে রাজনৈতিক-সচেতন করতে চেয়েছিলেন। হ্যাঁ, আমরা দেখি বাঙালির জাতীয়তাবাদ বিকাশে বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলন সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে। নিজস্ব জাতিসত্তা সৃষ্টিতে ভাষা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক ও গুরুত্ব পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব বাংলার জনগণ পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাজনৈতিক চরিত্র এবং একই সঙ্গে দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভুলগুলো বুঝতে পারে। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ বাঙালি হওয়ার পরও রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রশাসনিক দায়িত্ব, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকারসহ সর্বক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী কর্তৃত্ব শুরু করে। বাঙালি তথা পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষ সর্বক্ষেত্রে বঞ্চিত হতে থাকে। তখন রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বের বিকাশ লক্ষ করা যায়। পাকিস্তান সরকারের অগণতান্ত্রিক মনোভাব, পক্ষপাতমূলক সরকারি নীতি ও মুসলিম লীগের ভ্রান্তনীতির প্রতিবাদে ১৯৪৯ সালের জুন মাসে ঢাকায় আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়। মুসলিম লীগের ভ্রান্ত ও অসহিষ্ণু নীতির কারণে পূর্ব বাংলার সর্বস্তরের জনগণ আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এ সময়ে দলটি পূর্ব বাংলার জনগণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকসহ সব স্বার্থ রক্ষায় একদিকে আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত রাখে, অন্যদিকে সংসদ ও প্রাদেশিক সরকারের সর্বত্র সোচ্চার হতে থাকে। হাবিব সাহেব রাজনৈতিক দল গঠনের মাধ্যমে দেশের মানুষকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে চেয়েছিলেন এবং এ কাজে তিনি সফলও হয়েছিলেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে রাজনৈতিক আন্দোলন সর্বস্তরের জনগণকে সচেতন করেছিল।
কমেন্ট