র‌্যাব নাম বিলুপ্ত করে আসছে এসআরবি, জাতীয় সংসদে বিল উত্থাপন

র‌্যাব নাম বিলুপ্ত করে আসছে এসআরবি, জাতীয় সংসদে বিল উত্থাপন

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের আওতাধীন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিধান রেখে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’ বিল জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।


পরে বিলটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চার কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন পাঠাতে বলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

এদিন আরও দুটি বিল উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল-২০২৬ উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এর আগে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন-২০২৬’ নামের বিল উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিল দুটি অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।

এসআরবি বিলটি উত্থাপনে বিরোধী দল আপত্তি জানালেও পরবর্তীতে সমঝোতার ভিত্তিতে একমত পোষণ করেন। বিলটি উত্থাপনের সময় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বিরোধিতা করেন। নাহিদ ইসলাম বলেন, র‌্যাব ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে গুম, বিচারবহিভর্‚ত হত্যা, আয়নাঘর ইত্যাদি কারণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনের আগে প্রতিশ্র“তি দিয়েছিল র‌্যাব বিলুপ্ত করা হবে। বিএনপিও বলেছিল। তারা র‌্যাবের মতো আরেকটি প্রতিষ্ঠান করার কথা বলেনি। এখন নতুন মোড়কে র‌্যাব পুনর্গঠন করা হচ্ছে। এটা বিলুপ্ত করা হোক। বিশেষায়িত ইউনিট করতে হলে আগে সংসদে বিশদ আলোচনা করা হোক।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি যদি তখন উপদেষ্টা পরিষদে এ প্রস্তাবটি করতেন তাহলে খুশি হতেন। কিন্তু ১৮ মাসে একবারও সেটা মনে হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশের প্রধান ছিলেন কুখ্যাত বেনজীর। সেজন্য কি পুলিশ বিলুপ্ত করে দেব। তিনি বলেন, নির্বাচনি প্রতিশ্র“তি ছিল র‌্যাব নামে কোনো সংগঠন থাকবে না। সেটা বিলুপ্ত করা হচ্ছে। কিন্তু পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিট দরকার।

তখন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, তারা র‌্যাব বিলুপ্তির প্রস্তাব সমর্থন করেন। এটা বিলুপ্ত হোক। নতুন একটি সংস্থা করার বিষয়ে আরও চিন্তা-ভাবনা করে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। তিনি বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বিবেচনায় নেওয়ার আহŸান জানান।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নতুন যে বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করছি তার মধ্যে একাউন্টেবিলিটি ফিক্স করেছি, ট্রান্সপারেন্সি ফিক্স করেছি। ওখানে কমিটি গঠন করা হয়েছে। আপনি বিলের মধ্যে দেখবেন যে কোনো সদস্য যদি শৃঙ্খলাবিরোধী কাজে জড়িত হয় তাদের বিচারের জন্য, তদন্তের জন্য কি বডি করা হয়েছে, সেটা আগে ছিল না। তিনি বলেন, আপনারা স্থায়ী কমিটিতে অংশগ্রহণ করুন ওখানে আলাপ-আলোচনা হবে। যদি মতামত থাকে সেটা আমরা ওখানে গ্রহণ করব।

এ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা একাধিকবার পক্ষে-বিপক্ষে নিজেদের যুক্তি তুলে ধরেন। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিলটি উত্থাপন করেন এবং সংসদীয় কমিটিতে পর্যালোচনার জন্য ২ কার্য দিবসের জায়গায় ৪ কার্য দিবসের প্রস্তাব করেন। বিরোধী দল এতে সমর্থন জানায়। 

এসআরবি বিলে বলা হয়েছে, দেশের জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন এবং পুলিশ বাহিনীকে সহায়তার জন্য আধুনিক, পেশাদার, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক একটি বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন। একইসঙ্গে এ বাহিনীর ক্ষমতা প্রয়োগে স্বচ্ছতা, তদারকি ও কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। বিলের ১ ধারায় বলা হয়েছে, এই আইন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’ নামে অভিহিত হবে। বিলের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, পুলিশ বাহিনীর আওতাধীন স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট থাকবে।

সরকার প্রয়োজনের নিরিখে পুলিশবাহিনী, শৃঙ্খলাবাহিনী এবং নির্ধারিতসংখ্যক কর্মকর্তা, আর্মড পার্সোনেল বা কর্মচারী পদায়ন বা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে এই ইউনিট গঠন করবে। ইউনিটের সদর দপ্তর থাকবে ঢাকায়। এসআরবির একজন মহাপরিচালক থাকবেন। তিনি বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত অন্যুন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে সরকার কর্তৃক নিযুক্ত হবেন। মহাপরিচালক ইউনিটের প্রশাসনিক, আর্থিক ও অপারেশনাল ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন।

বিলের ১০ ধারায় দায়িত্ব ও কার্যাবলি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন, বেআইনি অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার এবং মাদক, সাইবার অপরাধ, গুম ও ভ‚মি দস্যুতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ। এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, মানব পাচার, অপহরণসহ মানবতাবিরোধী কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করার দায়িত্বও থাকবে। আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশ অনুসারে এসব অপরাধের তদন্তও করতে পারবে ইউনিটটি। কোনো স্থানে প্রবেশ, তল­াশি, জব্দ ও গ্রেফতারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে এসব ক্ষমতা ফৌজদারি কার্যবিধি ও বিদ্যমান অন্যান্য আইনের বিধান প্রতিপালন সাপেক্ষে প্রয়োগ করতে হবে।

বিলে বলা হয়েছে আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শক যে কোনো সময় এসআরবি মহাপরিচালককে কোনো ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবেন। মহাপরিচালক পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর বা তার ঊর্ধ্ব পদমর্যাদার কোনো সদস্যকে তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারবেন। এক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান অনুসরণ করতে হবে। তদন্তের প্রয়োজনে এসআরবির হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষমতা থাকার কথাও বিলে বলা হয়েছে।

কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের অভিযোগ বা আশঙ্কার যৌক্তিক কারণ থাকলে তাকে আটক করার ক্ষমতা রাখা হয়েছে। তবে আটকাদেশ প্রদানকারী কর্মকর্তাকে দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে এবং আটক সদস্যকে লিখিতভাবে কারণ জানাতে হবে। কোনো সদস্য ১৫ দিনের বেশি আটক থাকলে প্রতি সাত দিন অন্তর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দিতে হবে। 

বিলে এসআরবি সদস্যদের শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের জন্য গুরুদণ্ড ও লঘুদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে। এসআরবি সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অভিযোগ এবং বাহিনীর সদস্যদের অভ্যন্তরীণ সংক্ষোভ নিরসনে ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। আইন কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে র‌্যাব গঠনসংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট বিধান রহিত হবে। তবে নতুন বিধিমালা না হওয়া পর্যন্ত র‌্যাবের কোর্ট পদ্ধতি ও বিভাগীয় কার্যধারা বিধিমালা, ২০০৫ প্রয়োজনীয় অভিযোজনসহ এসআরবির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য থাকবে।

 

দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত নেপালকে ১০ লাখ ডলার সহায়তা বাংলাদেশের পরবর্তী

দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত নেপালকে ১০ লাখ ডলার সহায়তা বাংলাদেশের

কমেন্ট