আজও অবহেলিত নিঝুম অরণ্য হারিয়াকোনা

আজও অবহেলিত নিঝুম অরণ্য হারিয়াকোনা

110529aaপাহাড় থেকে অঝোরে ঝরছে জল। জলের এ শান্ত শীতল শ্রোতধারা বয়ে চলেছে বিরামহীন। সে এক অসাধারণ ঝরনা ধারা। এর মোহনা পাগলা নদীতে। সহজ সরল নদীটির বুকে জেগে ওঠেছে চর। চরের বালু চিক চিক করছে। পাশেই উঁচু টিলা। ঝরনা আর নদীর সৌন্দর্যে পাহাড়ি লীলাভূমি। যেন ঐশ্বরিক স্বপ্নপুরী। এর কূল ঘেঁষে নানা কারুকার্যে সাজানো উপজাতি এলাকা। এই গারো পাহাড়েরই এক নিঝুম অরণ্য গ্রাম হারিয়াকোনা। আদিবাসীদের বসবাসে গ্রামটিতে যোগ হয়েছে সৌন্দর্যর নতুন মাত্রা। ঝরনার দুই পাশে সবুজ বৃক্ষ। এর আচ্ছাদিত অসংখ্য উঁচু নিচু পাহাড়। যেন গভীর মমতা আর ভালোবাসায় গড়া। উপজাতিদের বর্ণিল জীবনধারা এখানে। তবে যোগাযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়ন না হওয়ায় গ্রামটি আজও চরম অবহেলিত। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পোড়াকাশিয়া। এর পাশেই শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার গারো পাহাড়ের শেষ গ্রাম হারিয়াকোনা। আজও এখানে পৌঁছায়নি আধুনিকতার ছোঁয়া। গ্রামের ঘরবাড়িগুলো পাহাড়ের চূড়ায়। দূর থেকে মনে হয় যেন আকাশছোঁয়া কুটির। শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাদের চেহারায়ই বোঝা যায় প্রকৃতির সঙ্গে লেনদেন বহু দিনের। এটাই যেন প্রকৃতির নিয়ম। প্রাকৃতিকভাবে বৈচিত্র্যময় গারো পাহাড়ের গভীর অরণ্য হারিয়াকোনা। অবেহেলিত গ্রামটি স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়নি। নেই কোনও স্বাস্থ্যসেবা। বিদ্যুৎ নেই। নাজুক স্যানিটেশন ও শিক্ষা ব্যবস্থাও। গ্রামের মানুষগুলোর দিন কাটে খুব কষ্টে। অভাব অনটন যেন ওদের নিত্য সঙ্গী। ভারত থেকে নেমে আসা বন্যহাতির তাণ্ডব। এতে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে মানুষের জীবন জীবিকার পথ। বন্যহাতির অভয়ারণ্য এ গ্রামেরই ঝোঁপ জঙ্গলে। ফলে বেপরোয়া শতাধিক বন্যহাতি প্রায়ই হামলা করে। এতে ক্ষতি হয় ফসল ও ঘরবাড়ির। এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছে শতাধিক মানুষ। শেরপুর শহর থেকে হারিয়াকোনার দূরত্ব প্রায় ৩৮ কিলোমিটার। এর মধ্যে আড়াই কিলোমিটার দুই পায়ে পাহাড়ি পথ। চলে না কোনও যানবাহন। কিংবদন্তি রয়েছে, গ্রামটিতে কেউ একবার যে পথে এসেছে সে পথে আর ফিরে যেতে পারেনি। 'হারিয়াকোনা' গ্রামটির নামকরণ সেজন্যই। গ্রামের উত্তর ও পূর্বে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পোড়াকাশিয়া। দুই দেশের সীমানা পিলার নম্বর ১০৯৩/১০৯৪। পশ্চিমে দিঘলাকোনা। দক্ষিণে বাবেলাকোনা। প্রায় চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের গ্রামটিতে রয়েছে প্রায় অর্ধশত টিলা ভূমি। টিলার ওপর বসতবাড়ি। চার শতাধিক আদিবাসী পরিবারের বাস এখানে। বেশিরভাগ গারো, কোচ, হাজং। তারা বেশিরভাগই ক্রিষ্টান ধর্মালম্বী। গ্রামটিতে রয়েছে একটি গির্জা, একটি জিবিসি পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি ফুটবল খেলার মাঠ, কয়েকটি মুদি ও চায়ের দোকান। প্রতি রবিবার এখানে ছুটে আসে গ্রামবাসী। উপাসনা ও ধর্মীয় কাজ সেরে তারা মেতে ওঠেন নানা আলোচনায়। এ দিন যেন এক আদিবাসীদের মিলনমেলা। পশ্চিম থেকে পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত গ্রামের মাঝে সড়কটির দুই পাশে প্রাকৃতিকভাবেই গাছের লতাপাতায় ঘেরা। গ্রামে প্রবেশ করতেই মনে হয় প্রকৃতি যেন আগন্তককে স্বাগত জানাচ্ছে। সম্প্রতি সরেজমিনে গেলে কথা হয় এখানকার আদিবাসী নেতা ও সাবেক ইউপি সদস্য মুক্তিযোদ্ধা মি. ভূপেন্দ্র মান্দার সঙ্গে। তিনি বলেন, "যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপের জন্য আমরা প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছি। এখানকার উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে উৎপাদনের লাভের অংশ পরিবহন খাতে খরচ হচ্ছে। এ কারণে উৎপাদনে আশাতীত লাভ পাচ্ছেন না তারা। " স্থানীয় কৃষক পনোয়েল সাংমা জানান, কেউ অসুস্থ হলে গাছের পাতা, শিকড়, কবিরাজ ও ঝাড় ফুঁকই একমাত্র ভরসা। চিকিৎসা নিতে হলে উপজেলা সদরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে হয়। অনেকের সামর্থ্য না থাকায় চিকিৎসাসেবা থেকেও বঞ্চিত তারা। হারিয়াকোনা গ্রামের কৃষকেরা আজও চাষবাদ করেন মান্দাতার আমলের পদ্ধতিতে। প্রাচীন কৃষি জ্ঞান ও উপকরণই তাদের সম্বল। কৃষি কর্মকর্তা রয়েছেন- এটা তাদের বিশ্বাস করানো কঠিন। বাঁচার তাগিতে তারা পরামর্শ নেন বিগত বছরে যারা ভালো ফলন পেয়েছেন তাদের কাছ থেকে। তাদের পরামর্শে ধানচাষের পাশাপাশি আদা, হলুদ, শিমুল আলু, আম, কাঁঠাল, লিচু, কলা, সুপারি, আনারস, কচু, বেগুন এবং শসাসহ বিভিন্ন শাকসবজি চাষ করছেন। এসব চাষাবাদে তাদের মনে বাসা বেঁধেছে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন। কৃষকদের উন্নত প্রযুক্তি ও আধুনিক চাষাবাদের কলাকৌশল এখন পর্যন্ত পৌঁছায়নি। কৃষি অধিদপ্তর বা কোন বেসরকারি সংস্থা এগিয়ে আসা জরুরি। এতে কৃষকরা সীমিত জমিতে চাষাবাদ করে লাভবান হবেন বলে মনে করেন ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান প্রাঞ্জল এম সাংমাসহ গ্রামবাসী। শ্রীবরদী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা নাজমুল হাসান জানান, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষকদের উন্নত প্রযুক্তি সম্পর্কে দক্ষ করে গড়ে তোলা হচ্ছে। এতে অল্প জমিতে বেশি ফলন পাচ্ছে তারা। পাহাড়বেষ্টিত হারিয়াকোনার কৃষকরা শাকসবজি ও ফলমূল চাষ করে ভাগ্য বদলের চেষ্টা করছেন। অনেকে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদে নেমেছেন। পাহাড়ের পরিত্যক্ত শত শত একর জমিতে এখন শোভা পাচ্ছে শাকসবজি ও ফলমূলের চাষাবাদ। ২-৩ বছরের মধ্যেই অনেকে দেখছেন স্বচ্ছলতার মুখ। কেউবা গবাদি পশুর খামার করে হয়েছেন শূন্য থেকে খামার মালিক। গারো পাহাড়ের অনেক স্থানে ঝোঁপ জঙ্গল আর বিরাণভূমি এখন গোচারণ ভূমিতেও পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের দাবি তুলেছে এলাকাবাসী। তাদের মতে, বিদ্যুৎ এলে বন্যহাতির কবল থেকে রক্ষা পাবেন তারা। এতে চাষাবাদ করা যাবে নিরাপদে। বদলে যাবে জীবন-জীবিকা। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তারা এগিয়ে যাবেন সমানতালে।
আর্থিক সমস্যার নানা কারণ জেনে রাখুন পূর্ববর্তী

আর্থিক সমস্যার নানা কারণ জেনে রাখুন

ভ্রমণে সব শখ মেটাবে পোখরা পরবর্তী

ভ্রমণে সব শখ মেটাবে পোখরা

কমেন্ট