জনগণের বিশ্বাস ও ভালোবাসা বড় শক্তি, নিরাপত্তা কড়াকড়ি যেন দূরত্ব তৈরি না করে: প্রধানমন্ত্রী
শিশু প্রবীণ গর্ভবতী ও ক্রনিক রোগীর ঝুঁকি বেশি
এডিস মশার কামড়ে চিকুনগুনিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সেই আশঙ্কা এখন আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে ঢাকা শহরের ঘরে ঘরে। দিন যতই যাচ্ছে চিকুনগুনিয়া নিয়ে ততই আতঙ্ক বাড়ছে মানুষের মধ্যে। চিকিৎসকরা আশ্বস্ত করেছেন, চিকুনগুনিয়ায় মৃত্যুভয় নেই। তবে শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী ও ক্রনিক রোগীদের চিকুনগুনিয়া হলে শারীরিক জটিলতা বাড়তে পারে। একই কথা বলা হয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটেও। ঘরে রোগ ছড়ালেও আক্রান্তরা অনেকেই জানেন না করণীয় বা সতর্কতা বিষয়ে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ কালের কণ্ঠ’কে বলেন, বয়স্ক মানুষের চিকুনগুনিয়া হলে ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে যাঁদের ডায়াবেটিস, কিডনি, লিভার, হূদরোগ, ক্যান্সার, হাঁপানি ইত্যাদি ক্রনিক রোগ রয়েছে তাঁদের চিকুনগুনিয়া হলে শারীরিক জটিলতা আরো বাড়াতে পারে। তিনি বলেন, বয়োবৃদ্ধ মানুষের রোগ প্রতিরোধ এবং সহ্য করার ক্ষমতা অনেক কম। যদিও তাঁদের জন্য আলাদা চিকিৎসা নেই। তার পরও পরামর্শ হলো, বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে চিকুনগুনিয়ার লক্ষণ দেখা মাত্রই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত এবং প্রয়োজনে কয়েক দিনের জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা উচিত।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিনের বিভাগের জেরিয়াট্রিক ইউনিটের প্রধান অধ্যাপক ডা. জিলন মিয়া সরকার বলেন, ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে কেউ চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হলে তারা একটু বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। সাধারণত এমন বয়সীদের ৩০ শতাংশেরই তিনটি বা তারও বেশি জটিল রোগ থাকে। আগের রোগ-বালাই নিয়ে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হলে তাঁরা আরো কাবু হয়ে পড়েন। তখন তাঁদের উন্নত পরিচর্যার বাড়তি দায়িত্ব নিতে হবে। এ সময় তাঁরা পানি পান করবেন প্রচুর, পরিপূর্ণ বিশ্রাম নেবেন, প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খাবেন। তবে অন্য কোনো ব্যথার ওষুধ মোটেও নয়। এই ভাইরাল ইনফেকশনের কারণে তখন অন্যান্য ইনফেকশনেরও ঝুঁকি বেড়ে যায়। সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
হূদরোগীদের চিকুনগুনিয়া ঝুঁকি কেমন—এ প্রশ্নের উত্তরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হূদরোগ বিভাগের প্রধান, বিশিষ্ট হূদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী বলেন, যাদের ক্রনিক হার্ট ডিজিজ আছে, ফুসফুসে বা কিডনির সমস্যা আছে তাদের চিকুনগুনিয়া হলে বিশেষ সাবধানতা মেনে চলা উচিত। চিকুনগুনিয়ায় বেশি পানি খেতে বলা হলেও তাদের ক্ষেত্রে এ সময় পানি খেতে হবে নিয়ম মেনে। চিকুনগুনিয়া হওয়ার পর যদি দেখা যায় রোগীর চেতনা লোপ পাচ্ছে অথবা শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, তবে বিলম্ব না করে কোনো মেডিসিন বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
গর্ভবতী মায়ের চিকুনগুনিয়া হলে হবু মা ও শিশু দুজনই মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। এ বিষয়ে দেশের হাইরিস্ক প্রেগন্যান্সি বিশেষজ্ঞ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিটোম্যাটারনিটি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম বলেন, চিকুনগুনিয়া যেহেতু উচ্চমাত্রার জ্বর, তাই গর্ভবতীদের হলে শিশুর মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে, এমনকি পেটের ভেতর শিশু মারাও যেতে পারে। মস্তিষ্কের বিভিন্ন সমস্যা যেমন : ব্রেন ড্যামেজ, খিঁচুনি, এনকেফালাইটিস ইত্যাদি হতে পারে। যেহেতু গর্ভস্থ শিশুটি মায়ের বডি ফ্লুইড গ্রহণ করছে, তাই মায়ের জ্বর ১০২ ডিগ্রি হলে গর্ভস্থ শিশুর জ্বর হবে আরো বেশি। এই ভাইরাস প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল দিয়ে গর্ভস্থ শিশুকে আক্রমণ করতে পারে। চিকুনগুনিয়ার প্রভাবে শিশুর জন্মগত ত্রুটি হতে পারে, গ্রোথ সমস্যা হয়ে ওজন কম হতে পারে, এমনকি সময়ের আগে বা প্রি-ডেলিভারিও হতে পারে। ডা. ফিরোজা বেগম বলেন, এ জন্য প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধের পাশাপাশি সাপোজিটরি দিয়ে বা বারবার স্পঞ্জ করে শরীর মুছে দিয়ে জ্বরের মাত্রা কমাতে হবে। এ সময় পানি বেশি পান করতে হবে। জ্বর যেন ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি না ওঠে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে এবং নিয়মিত চেকআপের সময় সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে অবশ্যই চিকুনগুনিয়ার বিষয়টি অবহিত করতে হবে। ঢাকা শিশু হাসপাতালের শিশু কিডনি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ হানিফ বলেন, সাধারণত এক বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি বেশি। শিশুদের চিকুনগুনিয়া হলে তারা ঘ্যান ঘ্যান করে, নড়াচড়া কম করে, শুয়ে থাকতে চায়। মশা মাথা ও পায়ে বেশি কামড়ায়। এ সময় তাদের ফ্লুইড খাবারের দিকে নজর দিতে হবে। মশারির ভেতরে রাখা, লম্বা জামাসহ হাত-পায়ে মোজা পরিধান, মশা নিরোধক ক্রিম দেহের উন্মুক্ত স্থানে লাগিয়ে রাখা উচিত।
কমেন্ট