মার্কিন অবরোধকে ফাঁকি দিয়ে মালয়েশিয়ায় বিক্রি হচ্ছে ইরানের তেল, চূড়ান্ত গন্তব্য চীন
মালয়েশিয়া উপকূলের বিশাল নোঙর এলাকাটি এখন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেল বিক্রির প্রধান বাজার হয়ে উঠেছে।
গত শনিবার (২৫ জুলাই) ইরানের তেলবাহী জাহাজ ‘হিউম্যানিটি’ মালাক্কা প্রণালি ও সিঙ্গাপুর হয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে মালয়েশিয়া উপকূলের দিকে অগ্রসর হওয়ার পর হঠাৎ করেই এর ‘অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (এআইএস)’ বা স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়।
স্যাটেলাইট ট্র্যাকিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৩৩০ মিটার দীর্ঘ অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজটি মালয়েশিয়ার ‘ইস্টার্ন আউটার পোর্ট লিমিটস (ইওপিএল)’-এ পৌঁছেছে। এটি দক্ষিণ চীন সাগরের ১,২০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এবং উপকূল থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
গন্তব্য চীন ও ডার্ক হওয়া জাহাজ
সামুদ্রিক নিরাপত্তাবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাগরে অপেক্ষমাণ মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে অন্য জাহাজে তেল খালাস করার প্রস্তুতি নিতেই সম্ভবত জাহাজটি ট্র্যাকিংয়ের বাইরে গিয়ে ‘ডার্ক’ হয়ে গেছে। ইউএস-চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড সিকিউরিটি রিভিউ কমিশনের তথ্যমতে, এই তেলের চূড়ান্ত গন্তব্য সম্ভবত চীন। ঐতিহাসিকভাবেই ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই কেনে দেশটি।
বিশ্লেষকদের মতে, দশকের পর দশক ধরে ইওপিএল এলাকাটি ইরান, রাশিয়া ও ভেনিজুয়েলার নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত তেলের একটি অনানুষ্ঠানিক বাজার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। স্যাটেলাইট ডেটা বলছে, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের পাঁচ মাসব্যাপী যুদ্ধ এবং ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধ (যা ১৩ এপ্রিল থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত চলে এবং ১৪ জুলাই আবার শুরু হয়) সত্ত্বেও ইওপিএল-এ এই কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত মেরিটাইম সিকিউরিটি মনিটরিং প্রজেক্ট সিলাইট-এর পরিচালক রে পাওয়েল আলজাজিরাকে জানান, এ বছরের শুরু থেকে তিনি এমন ৬২টি জাহাজ পর্যবেক্ষণ করেছেন, যেগুলো উপসাগরীয় অঞ্চল, ইওপিএল, হংকং এবং উত্তর চীনের মধ্যে চলাচলের সময় ভুয়া বা বাতিল হয়ে যাওয়া পরিচয় ব্যবহার করেছে। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির জ্যেষ্ঠ গবেষক এরিকা ডাউন্স জানান, এসব জাহাজ মূলত মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি নেটওয়ার্কের অংশ, যারা চীনের স্বাধীন ‘টিপট’ বা ছোট তেল শোধনাগারগুলোতে ইরানের তেল বিক্রিতে সহায়তা করে।
এরিকা আরও বলেন, ইরান থেকে চীনে যাওয়া অপরিশোধিত তেল আন্তর্জাতিক জলসীমায় এক জাহাজ থেকে আরেক জাহাজে স্থানান্তর করা হয়। তেলের উৎস গোপন করতে চীনে পৌঁছানোর আগে এই প্রক্রিয়াটি একাধিকবার হতে পারে।
চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বড় কোম্পানিগুলোর (যেমন- সিএনপিসি, সিনোপেক ও সিএনওওসি) তুলনায় এই ছোট শোধনাগারগুলো মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার আওতার বাইরে থাকে। তাই তারা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানের তেল কম দামে কিনতে বেশি আগ্রহী।
শান্ত জলসীমা ও আইনি ফাঁকফোকর
ইয়োকোসুকা কাউন্সিল অন এশিয়া-প্যাসিফিক স্টাডিজ (ওয়াইসিএপিএস)-এর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক কর্মসূচির পরিচালক ও মেরিটাইম নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ চার্লি ব্রাউন বলেন, মালয়েশিয়ার ইওপিএল সংলগ্ন নোঙর এলাকাটি আগের মতোই ব্যস্ত।
তিনি বলেন, যুদ্ধের আগে এবং সংঘাতের প্রতিটি পর্যায়েই সেখানে জাহাজগুলোকে নোঙর করতে এবং জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের মতো নানা কার্যক্রম চালাতে দেখা গেছে।
হংকংয়ের সমতুল্য আয়তনের ইওপিএল এলাকাটির সুবিধা হলো এর শান্ত জলসীমা, যা সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার সরবরাহকারীদের কাছে পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট কাছাকাছি। আবার এটি এমন দূরত্বে অবস্থিত যা ঐতিহাসিকভাবেই এলাকাটিকে আইনিভাবে একটি ধূসর বা অস্পষ্ট অঞ্চলে পরিণত করেছে। এলাকাটি মালয়েশিয়ার আঞ্চলিক জলসীমার বাইরে হলেও এর এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন (ইইজেড)-এর আওতাভুক্ত। তবে এই অঞ্চলটি সমুদ্রে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার চেয়ে মাছ ধরার অধিকার ও প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের বিষয়গুলোকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। মালয়েশিয়ার মেরিটাইম এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি এর আগে জানিয়েছিল, দুর্গম অবস্থান এবং অধিক্ষেত্রগত সীমাবদ্ধতার কারণে ওই এলাকায় টহল দেওয়া বেশ কঠিন।
অবশ্য কুয়ালালামপুর তাদের আইনি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। অবৈধ নোঙর, পুনরায় সরবরাহ (বাঙ্কারিং) এবং সরকারি অনুমোদন ছাড়া ইইজেড-এ জাহাজ থেকে জাহাজে পণ্য স্থানান্তর ঠেকাতে গত জুনে মালয়েশিয়া তাদের ইইজেড আইন সংশোধন করেছে। তবে এ বিষয়ে মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করেনি।
চার্লি ব্রাউনের মতে, যেকোনো সাধারণ দিনেই ওই এলাকায় ২০০টির মতো জাহাজ নোঙর করা থাকতে পারে, যার অর্ধেকই সম্ভবত ইরানের সঙ্গে যুক্ত।
আলজাজিরার পর্যালোচনা করা স্যাটেলাইট তথ্যে দেখা গেছে, গত এক মাসে হিউম্যানিটিসহ ইরানের পতাকাবাহী ১৮টি তেলের ট্যাংকার ইওপিএল-এ পৌঁছানোর পর ট্র্যাকিংয়ের বাইরে চলে গেছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) ডোর নামের আরেকটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারকে মালাক্কা প্রণালি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যেতে দেখা গেছে। ওইদিন ইওপিএল-এ অন্তত ৫০টি মার্কিন বা ইইউ-নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত জাহাজ তাদের এআইএস সিগন্যাল চালু রেখে অবস্থান করছিল। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সেখানে আরও অনেক ‘ডার্ক’ জাহাজ অবস্থান করছে।
পেমেন্ট মেকানিজম এবং চীনের ভূমিকা
ইউরোপভিত্তিক বৈশ্বিক পূর্বাভাস পরামর্শক সংস্থা ‘জিওপলিটিক্যাল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসেস'-এর মতে, ইওপিএল এলাকায় জাহাজগুলোর মধ্যে স্থানান্তরিত হওয়া ইরানের তেল বিক্রির কাজ সম্পন্ন হয় চীনের 'ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস)’-এর মাধ্যমে। এর ফলে মার্কিন নজরদারিতে থাকা সুইফট নেটওয়ার্কের বাইরে গিয়ে চীনা মুদ্রা রেনমিনবিতে তেলের দাম পরিশোধ করা যায়।
চীন আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের তেল কেনার কথা স্বীকার করে না। ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত চীনা দূতাবাসের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইওপিএল হয়ে চীনে ইরানের তেল পরিবহনের বিষয়ে তারা অবগত নন।
এর আগে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একাধিকবার জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র আরোপিত অবৈধ একতরফা নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিহীন লং-আর্ম জুরিসডিকশন ব্যবহারের বিরোধী।
তবে গবেষক এরিকার মতে, চীনের কাস্টমস ডেটা ইওপিএল দিয়ে যাওয়া কার্গোটির উৎস ও গতিবিধি সম্পর্কে কিছু সূত্র দেয়।
তিনি বলেন, গত বছর ইরান চীনে প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে, অথচ চীনের কাস্টমসের তথ্যে ইরান থেকে তেল আমদানির কোনো হিসাব নেই। একই সময়ে কাস্টমসের তথ্য দেখায় যে, মালয়েশিয়া থেকে চীনের আমদানি মাঝেমধ্যেই মালয়েশিয়ার নিজস্ব তেল উৎপাদনের পরিমাণকে ব্যাপকভাবে ছাড়িয়ে যায়। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, এই অপরিশোধিত তেলের একটি অংশ অন্য কোথাও থেকে এসেছে।
অন্যদিকে, বেইজিং মার্কিন আইনি ব্যবস্থা থেকে নিজস্ব শোধনাগারগুলোকে রক্ষা করতেও পদক্ষেপ নিয়েছে। এপ্রিলের শেষ দিকে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইরানের তেল কেনার দায়ে পাঁচটি টিপট শোধনাগারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ওই নির্দেশকে ব্লক করে দেয়। তাদের দাবি, এই নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ চলতি সপ্তাহে আরও ছয়টি তেলের ট্যাংকার ও হংকং-চীনভিত্তিক পাঁচটি কোম্পানির ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এগুলো ইরানের শ্যাডো ফ্লিট বা ছায়া নৌবহরের সঙ্গে যুক্ত এবং চীনে তেল পরিবহন করেছে। এ বিষয়ে বেইজিং এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের মতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে চীনা শোধনাগারগুলোর ইরানি অপরিশোধিত তেল কেনার পরিমাণ প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইওপিএল-এর মতো নেটওয়ার্কগুলো বাকি তেলের বিক্রি সচল রেখেছে।
কমেন্ট