নিউজিল্যান্ডের নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস, সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ছোট দলগুলো
আগামী ৭ নভেম্বর নিউজিল্যান্ডে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। জনমত জরিপ বলছে, এবারের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মধ্য-ডানপন্থী ন্যাশনাল পার্টির নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে।
রয়টার্স জানায়, বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো মধ্য-বামপন্থী লেবার পার্টি।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৩ সালের নির্বাচনের মতো এবারও সরকার গঠনে ছোট দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাদের সমর্থনই ঠিক করে দিতে পারে, শেষ পর্যন্ত কারা সরকার গঠন করবে। নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এমন দল ও তাদের নেতাদের পরিচয় তুলে ধরা হলো।
ন্যাশনাল পার্টি
নিউজিল্যান্ডের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ৫৬ বছর বয়সী ক্রিস্টোফার লুক্সন দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসতে চান। ২০২০ সালে অকল্যান্ডের বোটানি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। পরের বছর ন্যাশনাল পার্টির নেতা হন লুক্সন। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি এয়ার নিউজিল্যান্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন।
২০২৩ সালের নির্বাচনে অর্থনীতি ভালোভাবে পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার নেতৃত্বে জয় পায় ন্যাশনাল পার্টি। তবে গত এক বছরে তার নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল ও আগস্টে দলের সংসদ সদস্যদের আনা আস্থা ভোটে টিকে যান লুক্সন। আগস্টে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্রিস পেঙ্ক তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জনমত জরিপে দলের সমর্থন কমে যাওয়া, অর্থনৈতিক চাপ এবং জোটের শরিকদের মধ্যে মতবিরোধের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এবারের নির্বাচনেও অর্থনীতিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে ন্যাশনাল পার্টি। বাজেটে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য এনে উদ্বৃত্ত অর্জন এবং কিউইসেভার নামের পেনশন সঞ্চয় কর্মসূচি সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি।
লেবার পার্টি
৪৮ বছর বয়সী ক্রিস হিপকিন্সের নেতৃত্বে নির্বাচনে লড়ছে লেবার পার্টি। ২০২৩ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর আবারও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। ২০০৮ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন হিপকিন্স। জেসিন্ডা আরডার্ন পদত্যাগ করার পর ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। তবে ওই বছরের অক্টোবরে নির্বাচনে হেরে ক্ষমতা হারান। এরপর থেকে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন হিপকিন্স। এবারের নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, সরকারি সেবার মান বাড়ানো এবং অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে তার দল। লেবার পার্টির পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবহন খরচ কমানো, কর্মসংস্থান বাড়ানো, আবাসন ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ এবং সরকারি সেবা আরো উন্নত করা।
নিউজিল্যান্ড ফার্স্ট
উইনস্টন পিটার্সের নেতৃত্বে রয়েছে নিউ জিল্যান্ড ফার্স্ট পার্টি। ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত তিনি উপপ্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৯০-এর দশক থেকে তাঁর দল কখনো লেবার, আবার কখনো ন্যাশনাল পার্টির নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে জোট গঠন করেছে।
এবারের নির্বাচনে দলটি প্রস্তাব দিয়েছে, নিউজিল্যান্ডের নির্বাচনে শুধু দেশটির নাগরিকদের ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিক্রি—দুই কাজই করে এমন বড় কম্পানিগুলোকে আলাদা করার প্রস্তাব দিয়েছে দলটি। এ ছাড়া দেশটির বড় সুপারমার্কেট ব্যবসার একটি প্রতিষ্ঠানকে ভাগ করে দুটি আলাদা সুপারমার্কেট কোম্পানি গড়ার প্রস্তাবও রয়েছে। পিটার্স চান, নিউজিল্যান্ড প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসুক। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিতে দুটি লক্ষ্য রাখার পক্ষে তিনি। লক্ষ্য দুটি হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।
অ্যাক্ট নিউজিল্যান্ড
অ্যাক্ট নিউজিল্যান্ড ডানপন্থী ও ব্যক্তিস্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেওয়া একটি রাজনৈতিক দল। দেশটির সংসদের ১২৩টি আসনের মধ্যে বর্তমানে দলটির আসন ১১টি। ন্যাশনাল পার্টি ও নিউ জিল্যান্ড ফার্স্টের সঙ্গে জোটে রয়েছে দলটি। ডেভিড সেমুর দলটির নেতা। ২০১৪ সালের অক্টোবরে তিনি নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এবারের নির্বাচনের আগে অভিবাসন নিয়ে ছয় দফার পরিকল্পনা দিয়েছে অ্যাক্ট। এর মধ্যে রয়েছে গুরুতর অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের নিউজিল্যান্ড থেকে বহিষ্কার করা। তারা যত দিন ধরেই দেশটিতে বসবাস করুন না কেন, এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে বলে জানিয়েছে দলটি।অস্থায়ী কাজের ভিসার ওপর অতিরিক্ত ফি আরোপ এবং নতুন করে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়া ব্যক্তিদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে তাদের পরিকল্পনায়।
গ্রিন পার্টি
ক্লোয়ি সোয়ারব্রিক ও মারামা ডেভিডসনের যৌথ নেতৃত্বে রয়েছে গ্রিন পার্টি। পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া বামপন্থী দলটি অতীতে লেবার পার্টির নেতৃত্বাধীন সরকারকে সমর্থন দিয়েছে। এবারের নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, প্রকৃতি রক্ষা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়নব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার ওপর জোর দিচ্ছে দলটি। গ্রিন পার্টি সম্পদের ওপর কর এবং বড় কম্পানি, ব্যাংক ও বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মুনাফার ওপর বেশি কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে আয়ের প্রথম ১০ হাজার নিউজিল্যান্ড ডলারের ওপর কর না নেওয়া এবং অধিকাংশ করদাতার আয়কর কমানোর পরিকল্পনা করেছে তারা। ১০ হাজার নিউজিল্যান্ড ডলার প্রায় ৫ হাজার ৬১৪ মার্কিন ডলারের সমান। দলটি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় কিউইপাওয়ার নামে একটি বিদ্যুৎ কম্পানি গড়ে তুলতে চায়। পাশাপাশি বাড়িতে তাপ ধরে রাখার ব্যবস্থা উন্নত করা, সৌরবিদ্যুতের প্যানেল ও ব্যাটারি কেনার জন্য সুদবিহীন ঋণ দেওয়া এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মালিকানায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে অর্থায়নের প্রস্তাব দিয়েছে। এ ছাড়া কিউইমার্ট নামে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সুপারমার্কেটের একটি চেইন গড়ে তুলতে চায় দলটি। মুদি পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো ঠেকাতে আরো কঠোর নিয়ম চালুর প্রস্তাবও রয়েছে তাদের।
তে পাতি মাওরি
জনমত জরিপে তে পাতি মাওরি পার্টির সমর্থন ৫ শতাংশের নিচে। সাধারণভাবে সংসদে আসন পেতে দলগুলোর এই পরিমাণ ভোট প্রয়োজন হয়। তবে নিউজিল্যান্ডের নির্বাচনী ব্যবস্থায় মাওরি জনগোষ্ঠীর জন্য নির্ধারিত সাতটি বিশেষ আসনের কয়েকটিতে দলটি জিততে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এবারের নির্বাচনে মাওরি ভোটার তালিকায় নিবন্ধিত মানুষের সংখ্যা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে দলটি। মাওরি ভোটারদের জন্য নির্ধারিত সাতটি আসনের মধ্যে বর্তমানে ছয়টি তাদের দখলে রয়েছে। রাওইরি ওয়াইতিতি ও ডেবি গারেওয়া-প্যাকার যৌথভাবে দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ২০২০ সালের অক্টোবর থেকে তারা একসঙ্গে দলের দায়িত্ব পালন করছেন। গারেওয়া-প্যাকার জানিয়েছেন, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পরিবেশ রক্ষা এবং সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনা তাদের নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কমেন্ট